August 24, 2026, 6:32 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় সার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, কিন্তু কৃষকের হাতে যাচ্ছে না কুষ্টিয়ায় ফিরল দেবাশীষ ও স্ত্রী-সন্তানের নিথর দেহ, রাতেই স্ব স্ব ধর্মীয় রীতিতে শেষ বিদায় সরকারি বিজ্ঞাপনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএফপির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি রবীন্দ্র মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, প্রতিবাদ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নতুন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বরের মৃত্যু সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেবাশীষের অচেনা মৃত্যু এবং আমার অস্থির অন্তর ছয় মাসে ১ লাখ মামলা, মব কমলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশ্ন

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় সার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, কিন্তু কৃষকের হাতে যাচ্ছে না

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কাগজে-কলমে সারের কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আমন মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। কোথাও কোথাও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৯ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর ও মাগুরায় পুরো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়ায় চাহিদা ছিল ৬৮৭ মেট্রিক টন, বরাদ্দও ৬৮৭ টন। চুয়াডাঙ্গায় ১ হাজার ১৫৫ টন, মেহেরপুরে ১ হাজার ২৭৪, রাজবাড়ীতে ১৪৬, ঝিনাইদহে ১ হাজার ৬৫, খুলনায় ২৮০, সাতক্ষীরায় ৪০১, নড়াইলে ২৪৭, যশোরে ১ হাজার ৩৮২ এবং মাগুরায় ৫০০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান বলছে, বড় ধরনের সারসংকট থাকার কথা নয়। তবে মাঠের কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা।
আমন চাষের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় কুষ্টিয়ায় বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগের মৌসুমে জেলায় ৮৮ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩ লাখ টন। চলতি মৌসুমে আমন আবাদ হচ্ছে ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে।
কৃষকেরা বলছেন, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৯ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
কুমারখালীর বাঁশগ্রামের কৃষক রুস্তম আলী শেখ বলেন, তাকে ডিএপি কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ২৬ টাকা এবং ইউরিয়া ৩২ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। আরেক কৃষক জানান, সার নিতে গেলে তাকে বারবার চার-পাঁচ দিন পর আসতে বলা হয়েছে। পরে নির্ধারিত সময়ে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সার শেষ হয়ে গেছে।
ফলে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বৈপরীত্য—সরকারি নথিতে বরাদ্দ পর্যাপ্ত, কিন্তু বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না।
চলতি অর্থবছরে কুমারখালীতে উচ্চফলনশীল আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে ২ হাজার ২০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বিনা মূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ কর্মসূচির বাইরে থাকা কৃষকদের মধ্যে সার পাওয়া এবং দাম নিয়ে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
খুচরা সার বিক্রেতা তপন বেশি দামের জন্য ডিলারদের দায়ী করেছেন। তার দাবি, পেঁয়াজ তোলার মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই ডিলাররা সারের সংকটের কথা বলে প্রতি বস্তায় সরকারি দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ফলে খুচরা বিক্রেতারাও বেশি দামে সার সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং বেশি দামে বিক্রি করছেন।
তবে ডিলাররা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ডিলার শরিফুল ইসলাম বলেন, তারা খুব সামান্য লাভে সার বিক্রি করেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত দামে ইউরিয়া প্রতি বস্তা ১ হাজার ২৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ২৫০, ডিএপি ৯৫০ এবং এমওপি ৯০০ টাকা। পরিবহন বাবদ ডিলাররা প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা পান। কৃষকেরা অনেক সময় বাকিতে সার নিয়ে ছয় মাস বা এক বছর পর টাকা পরিশোধ করেন বলেও দাবি করেন তিনি। এ কারণে খুচরা বিক্রেতারা কেজিপ্রতি অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ টাকা নিতে পারেন বলে তার বক্তব্য।
কুষ্টিয়ার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। কোনো ডিলার বা সাব-ডিলার অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
মেহেরপুরে পরিস্থিতি আরও প্রকট বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। চলতি মৌসুমে জেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ হাজার ৮০০ হেক্টর। কৃষকদের অভিযোগ, বিশেষ করে টিএসপির সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম।
উজুলপুর গ্রামের কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত থাকা এক বস্তা সার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কলাচাষি আবেদ আলী জানান, তার আট বিঘা জমির জন্য আট বস্তা টিএসপি প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০ কেজি।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংকট টিএসপিতে। তার ভাষায়, বরাদ্দের এক-চতুর্থাংশ সারও তারা পাচ্ছেন না। তবে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, নিবিড় চাষাবাদের কারণেও সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মেহেরপুরে একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারবার চাষ হয়। এতে বাড়তি সার প্রয়োজন হয়, ফলে চাহিদা বেড়ে গিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিলপি রানি রায় বলেন, সারসংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে কৃষি বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
চুয়াডাঙ্গায় প্রশ্ন উঠেছে ডিলার ব্যবস্থাপনা নিয়েও। জেলার চারটি উপজেলায় বিএডিসি ও বিসিআইসি মিলিয়ে প্রায় ১২০ জন সার ডিলার রয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, এতসংখ্যক ডিলার থাকার পরও অল্প কয়েকজন ব্যক্তি সার সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। একই ব্যক্তির বিএডিসি ও বিসিআইসি—দুই সংস্থার ডিলারশিপ থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ যাচাই করতে ডিলার নিয়োগের নথি ও সার বিতরণের তথ্যসহ সরকারি রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
জীবননগরের কৃষক হারুনুর রশিদ আসকারি বলেন, পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় তিনি জমিতে সার প্রয়োগ করতে পারছেন না। তার ভাষায়, জমির ধানগাছে সার প্রয়োজন, কিন্তু তিনি সার সংগ্রহ করতে পারছেন না।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ডিলারদের অসাধু কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে ডিলার নিয়োগ করা হলে অনেক সমস্যাই কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
রাজবাড়ী ও ঝিনাইদহেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। রাজবাড়ীতে সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়ার চাহিদা ১৪৬ টন এবং ঝিনাইদহে ১ হাজার ৬৫ টন। কিন্তু মাত্র দুই বিঘা জমিতে চাষ করা কৃষক রুহুল কুদ্দুস সালেহ বলেন, সারসংকটের কারণে তার পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু এই পাঁচ জেলাতেই নয়, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর ও মাগুরাতেও সেপ্টেম্বরের চাহিদার বিপরীতে পুরো ইউরিয়া বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। তবে শুধু বরাদ্দের পরিসংখ্যান দিয়ে কৃষকের কাছে সঠিক দামে সার পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
দেশের সবচেয়ে বড় সার বাণিজ্যকেন্দ্র যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় গিয়ে সমস্যাটির আরেকটি চিত্র পাওয়া গেছে। গত এক সপ্তাহের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিউনিসিয়ায় উৎপাদিত কালো টিএসপি প্রতি বস্তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, মিসরের টিএসপি ১ হাজার ৭০০ এবং মরক্কোর টিএসপি ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জর্ডানের ডিএপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬৫০, চীনের ডিএপি ১ হাজার ৫৫০ এবং এমওপি ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সার সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের আওতায় বেসরকারি আমদানিকারকদের আমদানি করা সারের বস্তায় উৎপাদনকারী দেশের নাম উল্লেখ থাকে। তবে বিএডিসির আমদানি করা সারের ক্ষেত্রে তা থাকে না। কৃষকদের মধ্যে তিউনিসিয়ার কালো টিএসপির চাহিদা বেশি। এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি আমদানিকারকেরা পরিবেশকদের কাছ থেকে সার কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে যশোরে সারসংকটের কথা অস্বীকার করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় কোনো ধরনের সারের সংকট নেই। কৃষকেরা পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন। বেশি দামে সার কিনতে কৃষকদের বাধ্য করারও কোনো সুযোগ নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net